“ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ, ঐ খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা…”
আমরা অনেকেই শৈশবে এই ছড়াটি শুনেছি। এবং এখনো এটি তুমুল জনপ্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ও এনিমেশন বা ছোট ক্লিপ এর যুগে ছোটবেলার ছড়াগুলো আরও প্রাণবন্ত হয়ে পড়তে ও দেখতে পারি।

আমার এই ব্লগে এই ছড়ার মর্ম নিয়ে আলোচনা করা উদ্দেশ্য নয়। অনেক সময় শিশুছড়ার তেমন কোন মর্ম হয়ও না।
এই তাল গাছ ছড়া নিয়ে একটি সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক: আমরা কি লিখি “কানাবগি”, নাকি “কানা বগী”? এই সামান্য পার্থক্য আমাদের ভাষা, শিক্ষা এবং সামাজিক আচরণের ব্যাপারে কি কোন প্রভাব পড়তে পারে?
আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করতে চাইঃ
ছড়ার প্রেক্ষাপট ও শব্দের উৎস:
এটি খান মুহাম্মদ মইনুদ্দিন-এর একটি জনপ্রিয় শিশুতোষ ছড়া। এখানে “বগী” কোনো মানুষের নাম নয়; এটি একটি পাখি; বক পাখি বা গ্রাম-ঘাটে “বগা” বা “বগী” নামে সবাই চেনে।
ইংরেজিতে Indian Pond Heron-যার লোকজ নাম “কানাবগি” বা “কানাবক” বা “কানিবগি”। এদের আরও অনেকগুলো নাম হল “কানাবক”, “কোঁচবক”, “ধানপাখি”, “কানাবগি” বা শুধুই “কানিবক”। (তথ্যসূত্রঃ Rahman, 2013; উইকিপিডিয়া)।
“কানাবগি” বনাম “কানা বগী” একটি ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি:
“কানাবগি” (একশব্দ): একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির নাম (lexicalised form)।
“কানা বগী” (দুই শব্দ): “কানা” (শারীরিক অবস্থা) + “বগী”।
ভাষাবিজ্ঞানে এটিকে বলা হয় semantic segmentation, যেখানে একটি যৌগিক শব্দ ভেঙে নতুন অর্থ তৈরি হয় (Fromkin et al., 2018)।
শিশুরা সাধারণত শব্দকে ভেঙে অর্থ করে । ফলে “কানা বগী” তাদের কাছে একটি বার্তা দিতে পারে যে শারীরিক বৈশিষ্ট্য আর এক্ষেত্রে শারীরিক ভিন্নতা (বা প্রতিবন্ধকতা) “কানা” বা অন্ধ নামের আগে ব্যবহার স্বাভাবিক।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ শিশু প্রথমে কী শিখছে? একটি পাখির নাম, নাকি একটি “লেবেলিং পদ্ধতি”?
লোকজ নামকরণে শারীরিক বৈশিষ্ট্য ব্যবহার নতুন নয় । গ্রামীণ ভাষায় পাখি, প্রাণী, এমনকি মানুষকেও বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করা হতো।
কিন্তু ভাষার সামাজিক অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলায়। আরেকটা লোকজ গান ইন্টারনেট এ ঘুরে বেড়ায়:
“কানা বগী বড় হলো আজকে যে তার বিয়ে
বর সেজে তাই বোয়াল এলো ভাঙ্গা নৌকা নিয়ে”
আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি এই ছড়া বা গানের স্রষ্টা কেউই “বক” বা বগিকে “কানা” (Blind বা অন্ধ) অর্থে ব্যবহার করেননি। এটা ওই “কানিবগি” বা “কানাবগ” – এর অংশ হিসাবেই এসেছে । লেখকের স্বাধীনতা সব সময় থাকে এবং তাতে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু প্রশ্ন থাকে অন্যখানেঃ এটা যে blind অর্থে ব্যবহার হয়নি বা নামের পূর্বে simply কোনো “কানা” বা “অন্ধ” অর্থে ছন্দটা আছে নি, এটা বোঝানোর উপায় কী? বিশেষ করে শিশুরা যখন এটা পড়ছে বা পড়ানো হচ্ছে।
উল্লেখ্যে এই কানিবগি বা কানাবগির বেলায় এই নামটাও এসেছে ধারণা করা হয়ে থাকে যে বক পাখিটা মাছ শিকার করার সময় দাঁড়ানোর ভঙ্গি এক দিক দিয়ে দেখলে মনে হবে পাখিটার মাত্র একটা চোখ।
পাখিটার নাম যেমনি হোক না কেন, শিশুরা কিভাবে নিচ্ছে বা বুঝছে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।
আমি নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছি। আমি ছোটবেলা তো দূরে থাক, বড়বেলার অনেক পর্যন্ত এটা জানি যে বগীটা “কানা” (one-eye defect)। নামের অংশ হিসাবে না, বরং বক টা যে “কানা” বা “এক চোখ” সেটাই জানতাম । আপনি কি জানতেন বা জানেন?
আমার এই জানা বা না জানাটা কি অনেকের মতো নয়? বা আমার শিশুকালে আরও বিস্তারিত না জানতে পারা কি আমার একার বেলায় ঘটেছে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা ভাবার কারণ নেই যে সব স্কুল টিচার বা পিতা-মাতা শিশুদের extended অর্থ করে শেখাবে যে এটা just name; বগিকে কানা বা blind করে name calling করা নয়।
আবার আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে নামের আগে বা পরে ডাকা বা চেনানো অতি সাধারণ একটা ব্যাপার। সেই ক্ষেত্রে এই ছড়ার “কানা বগী” কে name calling বা শারীরিক লেবেল ধরে নিতে শিশুদের তেমন কোন প্রশ্নের উদ্রেক না হওয়াই স্বাভাবিক।
ভাষা, চিন্তা ও সামাজিক বাস্তবতাঃ
ভাষাবিজ্ঞানী Edward Sapir এবং Benjamin Lee Whorf – এর তত্ত্ব (Sapir-Whorf Hypothesis) অনুযায়ী, ভাষা মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে । আধুনিক প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক গবেষণাও একই কথা বলে-ভাষা শুধু প্রতিফলন নয়, এটি সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে (Shakespeare, 2014)।
যখন শিশু বারবার শোনে- “কানা” “খোড়া” কারোর নামের আগে বা পরে তখন একটি ধারণা তৈরি হয়ঃ শারীরিক ভিন্নতা পরিচয়ের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
“বাশা খোড়া” – ভাষা থেকে বাস্তব জীবনেঃ
এই তত্ত্ব বাস্তব জীবনে কীভাবে কাজ করে তার একটা বাস্তব গল্প বলি । আমাদের মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতায় একটি উদাহরণ দেখা যাক। একজন মানুষ, ধরে নেই তাঁর নাম ‘আবুল বাশার’। তিনি কর্মঠ, দায়িত্বশীল, পরিবারের উপার্জনকারী। কিন্তু সমাজ তাকে চেনে বা Refer করে “বাশা খোড়া” নামে। পায়ে সামান্য বিকৃতি আছে, তাই হাঁটার ধরন একটু আলাদা। তাকে যে এ নামে চেনা হয় তা ওই ব্যাক্তির অজানা নয়। ভাবুন তো?
এই নাম তার ব্যক্তিত্বকে সংকুচিত করে; তার সামাজিক পরিচয়কে বিকৃত করে এবং তাকে একটি স্থায়ী label এ আবদ্ধ করে । গবেষণায় দেখা যায়, এ ধরনের body-based labelling সামাজিক বঞ্চনা ও আত্মসম্মানহানির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত (WHO & World Bank, 2011)।
সাহিত্যে প্রতিবন্ধিতার উপস্থাপনঃ একটি বিস্তৃত প্রেক্ষাপট
এই সমস্যা শুধু ছড়া, লোকজ কথা বা আজকের যুগে রিলস বা শর্টস (Reels/Shorts)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা লোককথায় প্রতিবন্ধী চরিত্র প্রায়ই “দুর্ভাগা” বা “অভিশপ্ত” হিসাবেই পাওয়া যায়।
পাশ্চাত্য সাহিত্যে, যেমন The Hunchback of Notre-Dame, শারীরিক ভিন্নতা নাটকীয়তা ও করুণার সঙ্গে যুক্ত। পুরনো ইংরেজি নার্সারি রাইমে “blind”, “lame” শব্দের ব্যবহার ছিল সাধারণ তবে সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোর ভাষা ও উপস্থাপনা বদলানো হয়েছে (Hehir, 2002)।
বানান কি সমাধান?
আপনার গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি এখানে প্রাসঙ্গিক । “কানাবগি” একশব্দে লিখলে ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে । এটি সত্য । কিন্তু এটি আংশিক সমাধান। আর এটা সম্ভবও নয় ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে । বরং প্রসঙ্গ আসলে বা শিশুরা পড়লে বা simply curiosity নিয়ে discussion করা যেতে পারে।
ভাষার সামাজিক ব্যবহার আগে থেকেই বিদ্যমান এবং শিশুরা পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী ও সমাজ থেকে আরও বেশি শেখে । আর এর মাধ্যমে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে।
আমাদের করণীয়ঃ একটি বহুস্তরীয় দৃষ্টিভঙ্গি
১. ভাষাগত নির্ভুলতা ও প্রেক্ষাপট শিক্ষাঃ “কানাবগি” বা এরকম লোকজ নামের ভাষাগত সংগঠন করে বা footnote লিখে দেয়া যেতে পারে।
২. সম্মানজনক ভাষাঃ শারীরিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে পরিচয় না দেওয়া।
৩. সাহিত্য ও মিডিয়া সংস্কারঃ শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক উপস্থাপন।
উপসংহার একটি ছড়া, গান, লোকজ কথা, রিলস, শর্টস, নিরীহ হতে পারে, নিছক সাহিত্য এবং অনেক ক্ষেত্রে অনেক দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ (impactful) সাহিত্য বা বিনোদন । কিন্তু এর সঠিক ব্যাখ্যা বা পাঠন পদ্ধতি না হওয়া বা সাথে বডি-লেবেলিং এ আমাদের সামাজিক অভ্যাস তো রয়েছেই, সব মিলিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক মানসিকতা তৈরি করতে পারে । হয়তো “কানা বগী” থেকে “বাশা খোড়া” হয়ে যেতে পারে অথবা “বাশা খোড়া” বলতে বলতে “কানিবগি” কে “কানা বগী” পড়তে স্বাভাবিক লাগবে।
ড্রিম ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের লক্ষ্য- একটি এমন সমাজ গড়া, যেখানে মানুষ তার শরীর বা মানসিক প্রতিবন্ধকার aspects দিয়ে নয়, তার সামনে চলা, মর্যাদা ও সক্ষমতা অর্জনের অনুপ্রেরণা দিয়ে পরিচিত হবে।
পরিশেষেঃ আজ যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করলাম তারপরে একটি প্রশ্ন অবশ্যই আসে যে – আমাদের সমাজে যেখানে রাস্তা-ঘাটে প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক/সাহায্যপ্রার্থী সবচেয়ে বেশী যেটা বলে যে “আমি অন্ধ, আমি খোঁড়া, দুটি টাকা দেন…” তখন প্রতিবন্ধী জনিত বডি লেবেলিং নিয়ে সর্বস্তরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপ্তি কতটা পরিবর্তন সম্ভব? এটা নিয়ে লিখব নেক্সট ব্লগ। সাথে থাকুন।
তথ্যসূত্র (References):
- Fromkin, V., Rodman, R., & Hyams, N. (2018). An Introduction to Language.
- Hehir, T. (2002). Eliminating ableism in education. Harvard Educational Review.
- Rahman, A. (2013). বাংলাদেশের পাখি পরিচিতি.
- Shakespeare, T. (2014). Disability Rights and Wrongs Revisited.
- WHO & World Bank (2011). World Report on Disability.
“আমরা লিখি, লিখুন আপনিও। আসুন একসঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন পরিবর্তন করি। আপনার লেখাটি আমাদের পাঠাতে ইমেইল করুন [email protected] বা হোয়াটসঅ্যাপ করুন +61 405065222 নম্বরে।”


Leave a Reply